রক্ত (Blood)
রক্ত একধরনের তরল যোজক কলা যা বহু জৈব ও অজৈব পদার্থের সমন্বয়ে গঠিত সামান্য লবণাক্ত, আঠালো, ক্ষারধর্মী ও লালবর্ণের ঘন তরল পদার্থ যা হৃৎপিন্ড, ধমনী, শিরা ও কৈশিক জালিকার মধ্য দিয়ে নিয়মিত প্রবাহিত হয়। মানবদেহে মোট ওজনের শতকরা ৮ ভাগ রক্ত থাকে (গড়ে মানবদেহে ৫-৬ লিটার রক্ত থাকে)। রক্তের pH ৭.৩৫-৭.৪৫ অর্থাৎ সামান্য ক্ষারীয়। মানুষের রক্তের তাপমাত্রা ৩৬ - ৩৮ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড (গড়ে ৩৭ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড)। রক্তের আপেক্ষিক গুরুত্ব ১.০৬৫।
রক্তরস (Plasma)
রক্তরস হল এটি হালকা হলুদাভ তরল যা সাধারণত দেহের বিভিন্ন প্রকার রক্তকোষ ধারণ করে। রক্তরস মূলত কোষপর্দার বাইরের রক্তগহবরের মধ্যকার তরল পদার্থ। এর ৯০-৯২ শতাংশ পানি এবং ৮-১০% কঠিন পদার্থ। কঠিন পদার্থের মধ্যে জৈব(৭-৮%) এবং অজৈব ০.৯% আর কিছু গ্যাস রয়েছে। বিভিন্ন প্রকার প্রোটিন(অ্যালবুমিন, গ্লোবুলিন, ফাইব্রিনোজেন), গ্লুকোজ, ক্লোটিং উপাদান, ইলেক্টোপ্লেট Na+, Ca2+, Mg2+,HCO3-,Cl-, প্রতিরক্ষা মূলক দ্রব্যাদি: কোলেস্টেরল, লেসিথিন, বিলিরুবিন রয়েছে।
রক্তরসের কাজ
- রক্ত জমাট বাঁধার প্রয়োজনীয় উপাদানগুলো পরিবহন করে।
- হরমোন, এনজাইম, লিপিড প্রভৃতি দেহের বিভিন্ন অংশে বহন করে।
- টিস্যু থেকে বর্জ্য পদার্থ নির্গত করে রেচনের জন্য বৃক্কে পরিবহন করে।
- রক্তকণিকাসহ রক্তরসে দ্রবীভূত খাদ্যসার দেহের বিভিন্ন অংশে বাহিত হয়।
- শ্বসনের ফলে কোষে সৃষ্ট CO2 কে বাইকার্বনেট হিসেবে ফুসফুসে পরিবহন করে।
লোহিত রক্তকণিকা
হিমোগ্লোবিন নামে
শ্বাস-রঞ্জক যুক্ত, অক্সিজেন পরিবহনে
সক্ষম লাল রক্তকণিকাকে লোহিত রক্তকণিকা বলে।
লোহিত রক্তকণিকার
আকারঃ মানুষের
লোহিত রক্তকণিকা দ্বি-অবতল, গোলাকার হয়। পরিণত
লোহিত কণিকায় নিউক্লিয়াস থাকে না।
লোহিত রক্তকণিকার
আয়তনঃ লোহিত কণিকার গড়
ব্যাস ৭.২ মাইক্রোমিটার।
লোহিত রক্তকণিকার
সংখ্যাঃ একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের প্রতি ঘন মিলিমিটার রক্তে লোহিত কণিকার সংখ্যা
গড়ে ৫০ লক্ষ এবং প্রাপ্তবয়স্ক স্ত্রীলোকেদের রক্তে ৪৫ লক্ষ। ভ্রূণদেহে ৮০-৯০
লক্ষ এবং শিশুদের দেহে ৬০-৭০ লক্ষ। প্রতি ঘন মিলিমিটার রক্তে লোহিত কণিকার সংখ্যা
৫০ লক্ষের থেকে ২৫% কম হলে রক্তাল্পতা দেখা দেয় কিন্তু এ সংখ্যা ৬৫ লক্ষের থেকে
বেশি হলে তাকে পলিসাইথেমিয়া বলে।
লোহিত রক্তকণিকার উৎপত্তিঃ
ভ্রুণ অবস্থায় ভ্রূণের ভ্যাসকুলোসা অঞ্চল থেকে এবং জন্মের এক মাস পর্যন্ত যকৃত ও প্লীহা থেকে লোহিত কণিকা সৃষ্টি হয়। জন্মের পর লোহিত কণিকার আদর্শ উৎপত্তিস্থল লাল অস্থিমজ্জা।লাল অস্থিমজ্জার হিমোসাইটোব্লাস্ট কোষ থেকে লোহিত রক্ত কণিকা সৃষ্টি হয়। এর আয়ুস্কাল ১২০ দিন।
লসিকা কি?
লসিকা একরকম হালকা হলুদ বর্ণের স্বচ্ছ ক্ষারীয় তরল যোজক কলা। এটি একরকম পরিবর্তিত কলারস। লসিকার উপাদান অনেকটা রক্তের মত। তবে এতে প্রোটিনের পরিমাণ রক্তরসের অধিক। লসিকায় ফাইব্রিনোজেনের পরিমাণ খুব কম হওয়ায় লসিকা খুব ধীরে ধীরে তঞ্চিত হয়। লসিকায় কেবল লিম্ফোসাইট প্রকৃতির শ্বেত রক্ত কণিকা থাকে। লোহিত কণিকা ও অণুচক্রিকা থাকে না।
লসিকার কাজ
লসিকা কোষে কোষে পুষ্টি রস সরবরাহ করে এবং বিপাকীয় দূষিত পদার্থ গুলি কোষ থেকে রক্ত স্রোতে প্রেরণ করে।লসিকা মধ্যস্থ লিম্ফোসাইট শ্বেত কণিকার জীবাণু ধ্বংস করে। লসিকা ক্ষুদ্রান্ত্রের ভিলাই থেকে সরল ফ্যাট জাতীয় খাদ্য বস্তু শোষণ করে।দেহের যে সব স্থানে রক্ত পৌঁছাতে পারে না, সেই সব স্থানে পুষ্টি উপাদান, ভিটামিন প্রভৃতি লসিকার মাধ্যমেই পৌঁছায়।
মানুষের হৃৎপিন্ডের গঠন
হৃদপিন্ড কি ?
রক্ত সংবহনতন্ত্রের যে অঙ্গটি পাম্পের মতো সংকোচন ও প্রসারণের মাধ্যমে সারাদেহে রক্ত সংবহন করে সেটি হলো হৃদপিন্ড। জীবন্ত এ পাম্প যন্ত্রটি দেহের বিভিন্ন অংশ থেকে শিরা মাধ্যমে আনীত রক্ত ধমনীর সাহায্যে শরীরের বিভিন্ন অংশে প্রেরণ করে থাকে। একজন সুস্থ মানুষের জীবদ্দশায় হৃদপিন্ড গড়ে ২৬০০ মিলিয়ন বার স্পন্দিত হয়। একটি হৃদপিন্ডের ওজন প্রায় ৩০০ গ্রাম। স্ত্রীলোকে তা পুরুষের চেয়ে এক - তৃতীয়াংশ কম ।
হৃদপিন্ডের আকার , অবসথান , আকৃতি ও আবরণ
মানৃষের হৃদপিন্ড বক্ষগহ্বরের মধ্যচ্ছদার উপরে ও দুই ফুসফুসের মাঝ বরাবর বাম দিকে একটু বেশী বাঁকা হয়ে অবস্থিত। এটি বুকের বাঁমপাশে প্রায় ৬০ % অবস্থান দখল করে থাকে। লালচে-খয়েরি রঙের হৃদপিন্ডটি ত্রিকোণা মোচার মত। একজন পূর্ণবয়স্ক ব্যক্তির হৃদপিন্ডের দৈর্ঘ্য ১২ সে.মি প্রস্থ ৯ সে.মি। এটি একটি দ্বিস্তরী পেরিকার্ডিয়াম নামক পাতলা ঝিল্লিতে আবৃত। হৃদপিন্ডের প্রাচীর অনৈচ্চিক পেশী দিয়ে গঠিত। এসব পেশি হৃদপেশি বা কার্ডিয়াক পেশি নামে পরিচিত।
প্রকোষ্ঠ : মানুষের হৃদপিন্ড
চার প্রকোষ্ঠ বিশিষ্ঠ। উপরের দুটিকে ডান বা বাম অ্যাট্রিয়াম নিচের দুটিকে ডান বা বাম ভেক্টিকল বলে। হৃদপিন্ডের
স্বতঃস্ফুত প্রসারণকে ডায়াস্টোল এবং স্বতঃস্ফুত সংকোচনকে সিস্টোল বলে।
হার্টবিট-এর মায়োজেনিক নিয়ন্ত্রণ
মানুষের হৃৎপিণ্ড স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংকুচিত-প্রসারিত হয়ে রক্ত সঞ্চালন ঘটায়। বাইরের কোন উদ্দীপনা ছাড়াই হৃৎপিণ্ডের নিয়ন্ত্রণকে মায়োজেনিক নিয়ন্ত্রণ বলে। হৃৎপিণ্ডের প্রাচীরের কিছু রূপান্তরিত হৃদপেশি মায়োজেনিক প্রকৃতির জন্য দায়ী এ টিস্যু গুলো হচ্ছে---
SA Node
AV Node
Purkinje Fibre
Bundle of His
সাইনো-অ্যাট্রিয়াল নোডঃ
এটি ডান অ্যাট্রিয়াম ও সুপিরিয়র ভেনাক্যাভার ছিদ্রের সংযোগস্থলে অবস্থিত। SAN থেকে একটি অ্যাকশন পটেনশিয়াল ইলেক্ট্রিক্যাল সিগন্যালের মাধ্যমে হার্টবিট শুরু হয়। এ অ্যাকশন পটেনশিয়াল ছড়িয়ে সাথে সাথে স্নায়ু উদ্দীপনার অনুরূপ উত্তেজনার একটি ছোট ঢেউ হৃতপেশির দিকে অতিক্রান্ত হয়। এটি অ্যাট্রিয়ামের প্রাচীরে ছড়িয়ে অ্যাট্রিয়ামের সংকোচন ঘটায়। SAN কে পেসমেকার বলে কারণ উত্তেজনার ঢেউ এখানেই সৃষ্টি হয়।
অ্যাট্রিও-ভেন্ট্রিকুলার নোডঃ
এটি ডান অ্যাট্রিয়াম-ভেন্ট্রিকলের প্রাচীরে অবস্থিত। AV বান্ডেল-এর মাধ্যমে হৃৎউদ্দীপনার ঢেউ অ্যাট্রিয়া থেকে ভেন্ট্রিকলে প্রবাহিত হয়। SAN থেকে AVN-এ উদ্দীপনার ঢেউ পরিবহনে ০.১৬ সেকেন্ড দেরি হয়। ভেন্ট্রিকুলার সিস্টোল শুরুর আগেই অ্যাট্রিয়াল সিস্টোল সম্পূর্ণ হয়।
বান্ডেল অফ হিজ
AV বান্ডেল, বান্ডেল অফ হিজ নামক পরিবর্তিত হৃৎপেশী তন্তু-গুচ্ছের সাথে যুক্ত থাকে। বান্ডেল অফ হিজ ইন্টারভেন্ট্রিকুলার সেপ্টামে যুক্ত থাকে এবং দুটি শাখায় বিভক্ত হয়ে হৃৎপিণ্ডের অগ্রভাগ পর্যন্ত বিস্তৃত থাকে।
পারকিনজি ফাইবার
এ তন্তুগুলো বান্ডেল অফ হিজ থেকে উৎপন্ন হয়ে ভেন্ট্রিকলের প্রাচীরে জালক সৃষ্টি করে। বান্ডেল অফ হিজ থেকে উদ্দীপনা পারকিনজি ফাইবারের মাধ্যমে ভেন্ট্রিকলের প্রাচীরে ছড়িয়ে পড়ে ভেন্ট্রিকল দুটির সংকোচন ঘটায়।
মানবদেহে রক্ত সংবহন
সিস্টেমিক সংবহনঃ
যে সংবহনে রক্ত বাম নিলয় থেকে বিভিন্ন রক্ত বাহিকার মাধ্যমে অঙ্গগুলোতে পৌছায় এবং অঙ্গগুলো থেকে ডান অ্যাট্রিয়ামে ফিরে আসে তাকে সিস্টেমিক বা তন্ত্রীয় সংবহন বলে। সব সিস্টেমিক ধমনির উদ্ভব ঘটে অ্যাওর্টা থেকে আর অ্যাওর্টার উদ্ভব ঘটে বাম ভেন্ট্রিকল থেকে। অ্যাওর্টা ভেতর দিয়ে রক্ত প্রথম ধমনিতে পরে দেহের বিভিন্ন টিস্যু ও জালিকার ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়। জালিকার থেকে পুনঃ সংগৃহীত হয়ে উপশিরা, শিরা থেকে ভেনাক্যাভার মাধ্যমে ডান অ্যাট্রিয়ামে প্রবেশ করে।
পালমোনারী সংবহনঃ
§ যে সংবহনে রক্ত হৃৎপিণ্ডের ডান ভেন্ট্রিকল থেকে ফুসফুসে পৌছায় এবং ফুসফুস থেকে বাম অ্যাট্রিয়ামে ফিরে আসে, তাকে পালমোনারী সংবহন বলে। পালমোনারী সংবহন শেষে আনীত রক্ত আবার সিস্টেমিক সংবহনের মাধ্যমে সারা দেহে প্রেরিত হয়।
অ্যানজাইনা (angina)
কোনও কারণে যখন হার্টে পাম্প করার জন্য পরিমাণ মতো রক্ত
পৌঁছতে পারে না, তখন হার্টে একটি ভ্যাকুয়াম বা
শূন্যতা সৃষ্টি হয় এবং তখনই যে ব্যথাটি (chest pain) অনুভূত হয়, তাকেই বলা হয় অ্যানজাইনা (angina)।
কারণঃ
করোনারি ধমনির অন্তর্গাত্রে উচ্চ মাত্রার কোলেস্টেরল জমে ধমনির অন্তঃস্থ গহবর বন্ধ হয়ে গেলে হৃতপেশিতে অক্সিজেন ও পুষ্টি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায় এমতাবস্থায় হৃৎপেশি কর্তৃক রক্ত সরবরাহকালে উপজাত হিসেবে ল্যাকটিক এসিড তৈরী হয় যার দরুন বুকে ব্যাথা বা অ্যানজাইনা হয়।
লক্ষণঃ
ব্যয়াম বা অন্য শারীরিক কাজে, মানসিক চাপ, অতিরিক্ত ভোজন, শীতকাল বা আতংকে বুকে ব্যথা হতেপারে। ব্যথা ৫-৩০ মিনিট স্থায়ী হয়। বুকে ব্যথা এবং হজমে গন্ডগোল ও বমি বমি ভাব হতে পারে। ঘন ঘন শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়া কিংবা দম ফুরিয়ে হাঁপানো দেখা দিতে পারে। অনেক রোগী অ্যানজাইনা টের পায় না, তবে কাঁধ ও বাহু ভারী হয়ে আসে।
হার্ট অ্যাটাক
করোনারি ধমনীর মাধ্যমে অক্সিজেন সমৃদ্ধ রক্ত হৃৎপিণ্ডে প্রবেশ করে। ধমনীর অন্তর্গাত্রে চর্বি জাতীয় পদার্থ, ক্যালসিয়াম, প্রোটিন প্রভৃতি জমা হয়ে প্লাক গঠন করে। একে করোনারি অ্যাথেরেমা বলে। প্লাক বড় ও শক্ত হতে হতে একসময় অনুচক্রিকা জমা হয়ে রক্ত জমাট বাঁধে। ফলে অক্সিজেন সমৃদ্ধ রক্ত হৃৎপিণ্ডের হৃদপেশীতে সরবরাহ হতে না পারায় হৃদপেশী মরে যায় এবং হার্ট অ্যাটাক হয়। হার্ট অ্যাটাক এর আরেক নাম মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন।


স্বাগতম! 'Learning Biology For Life' কমিউনিটিতে।
আমাদের এই লেকচারটি নিয়ে আপনার মূল্যবান মতামত বা প্রশ্ন নিচে শেয়ার করুন।
🎓 শিক্ষার্থীদের জন্য: কোনো অংশ বুঝতে সমস্যা হলে নির্দ্বিধায় প্রশ্ন করুন।
🔬 গবেষক ও শিক্ষকদের জন্য: কোনো তথ্যগত সংযোজন বা কোলাবরেশনের প্রস্তাব থাকলে আমাদের জানান।
অনুগ্রহ করে গঠনমূলক আলোচনা বজায় রাখুন এবং স্প্যামিং থেকে বিরত থাকুন।